শতবর্ষী শিক্ষককে সম্বর্ধনা দিলেন ছাত্রছাত্রীরা, আপ্লুত গোটা গ্রাম

নিশীথ ভূষণ মাহাত, পুরুলিয়া: পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে জম্মগ্রহন করেছিলেন এক শিক্ষা দরদী মহাপ্রাণ । নাম শ্রী নাথুরাম মাহাত । ১৯৪৯ – ৫০ সাল নাগাদ তিনি মফ:স্বলের জঙ্গলাকীর্ণ প্রত্যন্ত গ্রাম জামবাদে শুরু করেছিলেন এক প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র । দীর্ঘ ৪/৫ বছর সম্পূর্ণ অবৈতনিক ভাবে শিশুদের পাঠদান করার পর ১৯৫৩ সালে সেটি সরকারী অনুমোদন লাভ করে । তারপর আর থেমে থাকতে হয়নি ৷ এই বিদ্যালয়ে ই প্রধান শিক্ষক হয় দীর্ঘ চল্লিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে শিক্ষকতা করার পর বিগত ১৯৯৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। এদিন ২২ শে নভেম্বর জামবদ প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাঁরই প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রী সহ গোটা গ্রামবাসী মিলে সংবর্ধনা প্রদান করলেন ৷

শিক্ষক হলেন সমাজ গড়ার কারিগর । সুস্থ সমাজ গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অপরসীম । বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা যদি যথাযথ ভাবে শিশুদের দেওয়া যায় তাহলে সেই শিশু ভবিষ্যতে একজন পরিপূর্ণ ব্যাক্তিত্ব সম্পন্ন সুনাগরিক রূপে গড়ে উঠতে পারে । তাই মানুষ গড়ার কারিগরদের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষকদের ভূমিকা আরও বেশী গুরুত্বপূর্ণ । মা বাবার পর এঁদের কাছেই একজন শিশু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত করে এবং এইসময়েই সে জীবন গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে । তাই জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যদি উপযুক্ত আদর্শবান গুরু মিলে যায় তাহলে তো বিষয়টা সোনায় সোহাগা ! সেই শিক্ষাকেন্দ্র পরিণত হয় স্বর্গে ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে ৷ এই দীর্ঘ চল্লিশ বছরে তিনি জামবাদ গ্রামটিকে শিক্ষার আলোয় ঝলমলে করে গড়ে তুলেছেন ৷
তাঁর বহু শিষ্য ই আজ উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত । কেউ প্রশাসনের কর্তা,কেউ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক , কেউ উকিল , আবার কেউ বা কৃষক,কেউ ব্যবসায়ী । তবে যে যাই হয়েছেন প্রতিষ্ঠিত অপ্রতিষ্ঠিত তাঁর ছাত্র ছাত্রীরা কেউ তাঁকে ভুলে যাননি, সবাই তাঁকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন আগেও এবং এখনও ।

শিক্ষক নাথুরাম মাহাত সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁর এক ছাত্র বর্তমানে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিশ্বনাথ মাহাত বললেন ” “আমাদের ভাগ্য ভালো ছিল যে আমরা এই শিক্ষকের কাছে শিক্ষার সুযোগ পেয়েছি ।” অপর এক ছাত্র দ্বারিকানাথ মাহাত (যিনি একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক) জানালেন – আমাদের জঙ্গলাকীর্ণ প্রত্যন্ত এই গ্রামে ইনি শিক্ষার প্রদীপ জ্বেলে আলোকিত করেছেন । এই মহানকে এটুকু সম্মান দিতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে”। আরেক ছাত্র গোলক বিহারী মাহাত, যিনি বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত; এক সময় পঞ্চায়েতের উচ্চ পদস্থ কর্মী ছিলেন ;তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন,” আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহাশয়কে সম্বর্ধনা প্রদান করতে পারাটা আমার কাছে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না”। আজ তাঁর বয়স শতবছর ছুঁই ছুঁই । এখনও পাতকুয়া থেকে জল তুলে স্নান করেন , সাইকেলে চড়ে ঘোরেন এক পাড়া থেকে অন্য পাড়া । দৈনিক কাগজ পড়েন নির্বিঘ্নেই !
তার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তাঁর বহু প্রাক্তন ছাত্র ছাত্রী সহ গোটা গ্রামবাসী ।




%d bloggers like this: