বার্ড ফ্লু সংক্রমণের আশঙ্কায় কানপুর চিড়িয়াখানার সমস্ত পাখি নিধনের নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদন: করোনা আবহের মধ্যে বার্ড ফ্লু সংক্রমণ। নতুন করে এই সংক্রমণ বেশ আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। দেশজুড়ে করোনা প্রতিরোধে একদিকে ড্রাই রান চলছে করোনা ভ্যাকসিনের। করোনা সংক্রমণের ভয়ে প্রায় ৬ মাস গৃহবন্দী ছিল দেশবাসী। ঘরবন্দি অবস্থায় থাকার পর ধীরে ধীরে ফের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন বেশিরভাগ মানুষ। আর তারপরই গোটা দেশে ছড়াতে আরম্ভ করেছে বার্ড ফ্লু (Bird Flu)’র আতঙ্ক। আর সেই সংখ্যাটাও দ্রুত বাড়ছে।

শনিবার পর্যন্ত যেখানে ৬টি রাজ্যে বার্ড ফ্লু’র জীবাণু পাওয়া গিয়েছিল, রবিবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাতে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বার্ড ফ্লু সংক্রমণ রোখার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে সবরকমের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশে দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে কানপুর চিড়িয়াখানায় ধরা পড়ল বার্ড ফ্লু সংক্রমণ।

এই পরিস্থিতিতে যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না যায়, তাই এখানে যে পাখিগুলি রয়েছে, সেগুলি নিধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কানপুর চিড়িয়াখানায় বার্ড ফ্লু-র খোঁজ মিলতেই জেলা প্রশাসন হাই অ্যালার্টে রয়েছে। পাশাপাশি পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত চিড়িয়াখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চারদিন আগে চিড়িয়খানায় মৃত বুনো মোরগের দেহে বার্ড ফ্লু-র সংক্রমণ মিলেছিল।

নির্দেশ মতো এনক্লোজারে থাকা সমস্ত পাখিকে রবিবার সন্ধের মধ্যে নিধন করতে বলা হয়েছে। চিড়িয়াখানা থেকে এক কিলোমিটার পর্যন্ত কন্টেনমেন্ট জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ এলাকায় মাংসের বিক্রয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। শনিবার এই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয় কেন্দ্র উত্তরপ্রদেশে বার্ড ফ্লু বা অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রাদুর্ভাবের তরফে।

সবমিলিয়ে দেশের সাতটি রাজ্যে এখনও পর্যন্ত বার্ড ফ্লু-র সংক্রমণ ঘটেছে। এরইমধ্য রয়েছে দিল্লি, ছত্তিশগঢ় ও মহারাষ্ট্রেও। সেসব রাজ্যে পরীক্ষার জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে। এর ফলাফল এখনও জানা যায়নি। টেস্টে উত্তরপ্রদেশ ছাড়াও কেরল, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, হরিয়ানা ও গুজরাতে বার্ড ফ্লু-র সংক্রমণের হদিশ মিলেছে।

এখনও পর্যন্ত সাতটি রাজ্যে এই রোগ সংক্রমণের খবর প্রকাশ্যে এসেছে, মৎস্য, পশুপালন ও দুগ্ধজাতপণ্যমন্ত্রক এক বিবৃতিতে তা জানিয়েছে। এরপর যাতে এই রোগ আর ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য বিভাগ সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিকে নির্দেশিকা পাঠিয়েছে। ছত্তিশগঢ়ের বালোড জেলায় একটি পোল্ট্রিতে পাখি ও বন্য পাখীদের মৃত্যু ঘিরে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তাদের সংশ্লিষ্ট ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

রান্না করা পোলট্রি পণ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে বার্ড ফ্লু-র সংক্রমণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের কথায়, রান্না করা পোলট্রির খাবার থেকে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে সাধারণত সংক্রমিত হয় না। এই ভাইরাস তাপে ধ্বংস হয়ে যায়, এই ভাইরাসের শক্তি কমে যায় বা মরে যায়। কিছু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “বার্ড ফ্লু বা অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা পাখিদের এক ধরনের জ্বর। যার জন্য দায়ী H5N8 ভাইরাস। এই ভাইরাসের উৎপত্তি হয় স্বাভাবিকভাবে জলজ পাখিদের মধ্যে। তা ঘরোয়া পোলট্রিতেও সংক্রমিত হতে পারে। এমনকি সংক্রমণ ছড়াতে পারে অন্যান্য পাখি ও পশুদের মধ্যে”।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে মাংস কোনওভাবেই কাঁচা না খেয়ে ৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা তার বেশি তাপমাত্রায় রান্না করে খাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। দিল্লিতে বার্ড ফ্লু ছড়িয়েছে বলে কোনও কথা প্রকাশ্যে না এলেও গাজিপুরে থাকা শহরের সবথেকে বড় পোলট্রি ফার্ম ১০ দিনের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। জ্যান্ত পাখিও দিল্লিতে আমদানি করার বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। অরবিন্দ কেজরিওয়াল জানিয়েছেন, বার্ড ফ্লু সংক্রমণ হওয়ার আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যাতে দিল্লি সেফ থাকে। এমনকি অন্য জায়গা থেকে এখানে পাখি নিয়ে আসার উপর সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

জানা গিয়েছে, দিল্লিতে সঞ্জয় লেকে কয়েকটি হাঁস মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তারপরই নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে মহারাষ্ট্রে মুম্বই, ঠানে, দাপোলি, পার্ভানি ও বিড় জেলায় মৃত কাকেদের নমুনা পরীক্ষার জন্য ভোপালের আইসিএআর-ন্যাশনাল ইন্সস্টিটিউট অফ হাই সিকিউরিটি অ্যানিমেল ডিজিজ (আইসিএআর-এনআইএইচএসএডি)-তে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রক জানিয়েছে, আইসিএআর-এনআইএইচএসএডি-র পরীক্ষায় হরিয়ানায় পাঁচকুলায় জেলায় দুটি পোল্ট্রি ফার্মে পাখিদের মধ্যে বার্ড ফ্লু-র সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছিল।

এরপর অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা পজিটিভ হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে মধ্যপ্রদেশের শিবপুরী, রাজগড়, শাজাপুর, আগর ও বিদিশা জেলায়, উত্তরপ্রদেশের কানপুর জুললিক্যাল পার্ক, রাজস্থানের প্রতাপগড় ও দৌসা জেলায় পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে। এর আগেও সংক্রমণের ভয়ে কেরলের দুটি জেলায় এখনও পর্যন্ত ৬৯ হাজার পাখি নিধন হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্যগুলিতে জলাশয়, পাখির মাংসের বাজার, চিড়িয়াখানা, পোলট্রি ফার্মগুলিতে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। কোনও পাখি মারা গেলে সেইসঙ্গে মৃতদেহ দ্রুত সরিয়ে ফেলা ও পোলট্রি ফার্মগুলিতে বায়ো সিকিউরিটি জোরদার করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে বার্ড ফ্লু সংক্রমণের ফলে উদ্বেগের প্রভাব পড়েছে পোল্ট্রি শিল্পে। চাহিদা হ্রাসের কারণে দামও কমে গিয়েছে ডিম ও ব্রয়লার চিকেনে।




%d bloggers like this: