ব্রিটেনে করোনার নয়া স্ট্রেনে চাপ বাড়ল, চিহ্নিতকরণে বিশেষ সতর্কতা নিল ভারত

নিজস্ব প্রতিবেদন: বিশ্বে করোনার প্রভাব কাটতে না কাটতেই ব্রিটেনে করোনার নয়া স্ট্রেনের আবির্ভাব। গোটা ব্রিটেন জুড়ে এখন একটাই আতঙ্ক, কতটা ভয়াবহ হতে চলেছে এই করোনা! এদিকে সেদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, নয়া করোনার স্ট্রেন হাতের নাগালে চলে যাচ্ছে। এর প্রভাব আগের থেকেও অনেক বেশি। এমনকি এই করোনার নয়া স্ট্রেন আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। ব্রিটেনের এই করোনার নয়া স্ট্রেনের খবর পেয়ে বাকি দেশ ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিতে শুরু করে দিয়েছে। নয়া করোনা স্ট্রেন যাতে ভারতে না প্রবেশ করে তাই ব্রিটেনের বিমান ভারতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। এছাড়া প্রতিটি এয়ারপোর্টে নানান বাধা-নিষেধ জারি হয়েছে। ভারতে এখনও করোনার এই নতুন স্ট্রেনের খোঁজ না মিললেও, এই নয়া ভাইরাসের উপর নজর রাখতে ‘জিনোমিক সার্ভেল্যান্স কনসরটিয়াম’ গঠন করল কেন্দ্র। এই সার্ভেল্যান্স কনসরটিয়াম দিল্লিতে ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি)-এর নেতৃত্বে কাজ করবে। পাশাপাশি ব্রিটেন থেকে যারা সম্প্রতি ফিরেছে তাদের খোঁজ চলছে এবং সকলকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা বলা হয়েছে। সাথে যাত্রীদের করোনা টেস্টও করা হয়েছে। ব্রিটেন থেকে ফিরে আসা ৫০ জনের জিনোম সিকোয়েন্স করা হচ্ছে বিভিন্ন গবেষণাগারে।যদিও এখনও এটা নিশ্চিত হয়নি যে ভারতে কোথাও এই করোনার নয়া স্ট্রেনের দেখা মেলেনি।

শনিবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানিয়েছে, প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই কাজ চলছে। প্রতিটি অঞ্চল থেকে পাঁচ শতাংশ কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীর নমুনা জিনোম সিকোয়েন্স করা হবে। মন্ত্রকের তরফে বলা হয়েছে, ব্রিটেনে করোনা ভাইরাসের নতুন স্ট্রেন ধরা পড়ার পরই সর্তক হয়েছে ভারত সরকার। সাথে সাথেই এদেশেও দ্রুত চিহ্নিতকরণের জন্য জিনোম সিকোয়েন্স চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের নতুন স্ট্রেন(প্রজাতি) ঘিরে বছরশেষে ফের আতঙ্ক ছড়াল এ দেশেও। আর তারপরই একে একে কার্ফিউ শুরু হয়েছে রাজ্যে। মহারাষ্ট্রের পর এবার কর্নাটকেও নাইট কার্ফু জারি হয়েছে। আগামী ২ জানুয়ারি পর্যন্ত রাত ১০ টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কার্ফু জারি থাকবে বলে জানিয়েছেন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বি এস ইয়েদুরাপ্পা। রাজস্তানেও কার্ফিউ জারি হয়েছে। সাথে সাথে এ বছর বড়দিন উৎসব উজ্জাপনেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে রাজস্থান সরকার। ভারত সহ লন্ডন ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় লকডাউন জারি করা হয়েছে। ব্রিটেনের পাশাপাশি ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলিও করোনার নয়া স্ট্রেন নিয়ে ইতিমধ্যে বেশ সতর্ক হয়েছে। সূত্রের খবর, ২৩ ডিসেম্বর থেকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইংল্যান্ডে সঙ্গে সমস্ত বিমান পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নয়া দিল্লি। যদিও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. হর্ষবর্ধন জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাসের নয়া আতঙ্কিত হওয়ার তেমন কারণ নেই।

অন্য সমস্ত আরএনএ ভাইরাসগুলির মতো, সার্স-সিওভি-২ ভাইরাসও ঘনঘন চরিত্র বদল করে। মন্ত্রক জানিয়েছে, মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বিধি বজায় রাখার মাধ্যমে এই নয়া করোনা ভাইরাসের স্ট্রেন রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা জানান, যে প্রতিষেধকের ট্রায়াল চলছে তাতে সফল মিললে সেই প্রতিষেধক এই করোনা নয়া স্ট্রেনকে রুখতে সক্ষম। ব্রিটেনে করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেন মেলার পরই করোনা রুখতে নানান পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে দেশের প্রায় প্রতিটি রাজ্য। করোনা টেস্ট, চিকিৎসা এবং নজরদারি চালানোর কৌশল নিয়ে শনিবার বৈঠকে বসেছে ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স। নেতৃত্বে ছিলেন নীতি আয়োগের সদস্য (স্বাস্থ্য) ভি কে পল এবং আইসিএমআরের ডিরেক্টর জেনারেল বলরাম ভার্গব। ব্রিটেনের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এই ঘোষণার পরপরই এ পর্যন্ত ৪০টি দেশ UK-এর উড়ান বন্ধ করে দিয়েছে। আইসিএমআর-এর মহামারীবিদ্যা এবং সংক্রামক রোগ বিষয়ক প্রধান ডাক্তার সমীরণ পান্ডা জানান, “এখনও পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষায় ব্রিটেনের স্ট্রেনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনও কিছু আমরা এখানে পাইনি।পুনার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি ছাড়াও দেশের কোনও ল্যাবরেটরিতে জিনোম সিকোয়েন্সিং করে নমুনায় ভাইরাসের এই রূপান্তরটি (mutation)-র প্রমাণ মেলেনি”।

ব্রিটেনের এই নয়া স্ট্রেন ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত, তাই এই স্ট্রেনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ভারতে চিহ্নিত করা বেশ কঠিন। তবে এখনি চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রোটোকল পরিবর্তন করার দরকার নেই বলে জানিয়েছে জাতীয় টাস্ক ফোর্স। পাশাপাশি সার্স-সিওভি-২ ভাইরাসের জিনোমিক সার্ভেল্যান্স চালিয়ে যাওয়াও বেশ কঠিন। অন্যদিকে সব গবেষণাগারে এধরনের পরীক্ষা করার মতো কাঠামো নেই। দিল্লি, হায়দরাবাদ ও ভুবনেশ্বরে এধরনের জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়। এ রাজ্যে এই পরীক্ষা হয় কল্যাণীর ডিবিটি-ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োমেডিক্যাল জিনোমিক্সে।

ভারতে ২১ থেকে ২৩ ডিসেম্বরের মধ্যে ব্রিটেন থেকে ভারতে ফেরা সব যাত্রীদের আরটি-পিসিআর টেস্ট করা হয়েছে। এই টেস্টে যাঁদের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে আইসোলেশনে রেখে হোল জিনোম সিকোয়েন্সিং করা হচ্ছে। জানানো হয়েছে, জিনোম সিকোয়েন্স পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে নিয়ে তারপরেই তাঁদের বাড়ি ফেরার অনুমতি দেওয়া হবে। পাশাপাশি ২৫ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বরের মধ্যে যাঁরা ব্রিটেন থেকে ফিরেছেন তাঁদের উপরেও স্টেট সার্ভেল্যান্স ইউনিট ও ডিস্ট্রিক্ট সার্ভেল্যান্স ইউনিটের মাধ্যমে নজরদারি রাখা হচ্ছে।




%d bloggers like this: