সুইসাইড প্রিভেনশন আর্টিকেল(মানসিক স্বাস্থ্য ও আমরা)

0 1

সুমনা বাগচী,কলকাতা:
মেধা কে নিয়ে মা বাবার খুব গর্ব।সেই ছোট্ট বেলা থেকে স্কুলে ফাস্ট ছাড়া কোনো দিন সেকেন্ড হয় নি। ড্রয়িং,সুইমিং,জিমন্যাস্টিক, ক্যারাটে সব কিছুতেই মেধা সমান পারদর্শী।সেই জন্য এরকম সোনার টুকরো মেয়ে কে তো বেশি কারুর সাথে মিশতে দেওয়া উচিত না,তাই বাড়িতে কম্পিউটার,আর সব রকমের ব্যবস্থা করা আছে।মেধা মোবাইল আর কম্পিউটার কেই নিজের সাথী ভেবেছে, তাই তাদের কে মনের কথা বলে,সময় কাটায়।একদিন সকালে মেধার ঘুম থেকে উঠতে দেরি দেখে মা দরজা ধাক্কা দেয়,কিন্তু মেধা কোনো সাড়া দিল না,অবশেষে দরজা ভেঙে যে দৃশ্য মেধার মা দেখলেন,সে নিয়ে কৃতী সন্তানের মা বাবা প্রস্তুত ছিলেন না। বিছানায় লুটিয়ে আছে মেধার শরীর আর ঠিক তার পাশে রাখা রক্তাক্ত ব্লেডের সাথে একটা সুইসাইড নোট।মা আমি খুব ক্লান্ত

দ্বিতীয় ঘটনাটি অভিনব বাবু কে নিয়ে।
সরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মচারী পাঁচ বছর আগে অবসর নেন।এতদিনের ব্যস্ততা ক্রমশ কেমন ক্লান্তিতে হারিয়ে যায়।রোজ সকালে উঠে বেরোনোর ব্যস্ততা নেই,বাড়িতে সময় কাটে না,নীলিমা দেবীর চলে যাবার পর তিনি আজ বড়ই একা।একমাত্র ছেলে ব্যাঙ্গালোরে কর্মরত।এতটাই ব্যাস্ত যে ফোনে পাওয়া যায় না।বাড়ির পুরনো ভৃত্য রমেশ তাঁর একমাত্র সাথী।খুব একা লাগে তাঁর।একদিন রোজ কার সেবনের ঘুমের ওষুধের হাত ধরেই হারিয়ে গেলেন তিনি।আর রেখে গেলেন তাঁর দুঃখের সাথী ডাইরি কে।প্রত্যেক পাতায় লেখা,আমি বড়ো একা

এই দুটো ঘটনা কোনো গল্প না বাস্তবের এক রূঢ় প্রতিচ্ছবি।কোথাও মা বাবার গর্বের সন্তানের আত্মহনন আর অন্য দিকে রিক্ত মনে চলে গেলেন অভিনব বাবু।

১)দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা আর বয়েসে র ফারাক অনেক টা।কিন্তু কোথাও তারা একা।আর এই একাকিত্ব তাঁদের ইচ্ছা মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য করলো।কারণ তারা মনে করেছিল মৃত্যু হলো মুক্তির একমাত্র পথ।

২)আমরা বর্তমানে জীবনের ঘোড় দৌড় করতে ভীষন ব্যস্ত।তাই সন্তান কে সব কিছু দেবার সাথে সাথে আমাদের মনের দেওয়া নেওয়া টা হারিয়ে গেছে।মা বাবার হাত ধরে বেড়াতে যাওয়া,প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা,সন্তান দের সাথে গল্প করা কোনোটাই আজ আর সম্ভব হয় না।কারণ আমরা খুব ব্যস্ত।আর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে জীবনের সমস্ত চ্যালেঞ্জ জিত তে চাই।

৩) মা বাবা কাছে থেকেও কেনো এত পর।দূরত্ব কেনো আসছে,ভেবেছেন কখনো? সন্তানকে বুকের মাঝে নিয়ে তাকে কি সেই আগের নিরাপত্তা দিচ্ছেন আপনি? স্বামী স্ত্রীর সমস্যার মাঝে সন্তানের হাঁপিয়ে ওঠা দেখেছেন কখনও??

৪)বাবা মায়ের বয়স মানেই তাঁদের সব কাজ শেষ সেটা ভুল,জীবনের এই অবসর সময়ে সব থেকে ভালো বন্ধু আমরা সন্তান রাই।তাদের দিনে ফোন করা,খোজ নেওয়া,মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া ,জড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেও এক প্রশান্তি অনুভব করেন তাঁরা।আপনার মনে পড়ে? স্কুলে বোকা খেয়ে ফিরে আপনি মাকে জড়িয়ে ধরে নিরাপত্তা খুঁজতেন. আজ কি সেই নিরাপত্তা তাঁদের দিচ্ছেন আপনি?

বন্ধুরা,
আমরা সবাই খুব ব্যস্ত ।আর জীবন যুদ্ধের পথে ছুটে চলেছি।কিন্তু একটু থেমে নিজের কথা ভাবার পাশে পাশে আমাদের চার পাশের মানুষদের কথা কি একবারও ভাবতে চাই? ওরা কোথাও একাকীত্বের শিকার,কিছু বলতে চায় আমাদের ,একটু শুনুন তাদের সময় দিন।নাহলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যাবে।আত্মহনন খুব সহজ না,কারণ প্রতিনিয়ত নিজের সাথে যুদ্ধ করতে করতে হেরে গিয়ে মৃত্যুর পথ বেছে নেওয়া খুব খুব কঠিন।

বন্ধুরা চেষ্ঠা করুন আপনার কাছের মানুষদের পাশে থাকতে,তাদের একটু সময় দিতে,কারণ তারা কিছু বলতে চায়।একেই আমরা sharing and caring
বলে থাকি।

সবাই সজাগ হন।কাছের মানুষদের মনের দিকে ঝুঁকে দেখুন,দেখতে পাবেন অনেক না বলা কথার মেঘ জমে আছে।আমরা নিজেরা এগিয়ে এলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।

ভালো থাকুন বন্ধুরা…
সুস্থ থাকুন..
নিজের মনের কথা শুনুন।
জীবন অনেক সুন্দর।আর সুন্দর আমাদের পৃথিবী।নিজেকে সেই সৌন্দর্যের থেকে চির তরে সরিয়ে নেওয়ার আগে একবার কাছের মানুষদের দিকে তাকান ।
কারণ আপনার উপর অনেকেই নির্ভর করে আছেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: