কি চলছে আপনার শিশুর মনে,জানুন এখনই !

0 1

সুমনা বাগচী,সাইকোলজিক্যাল কাউন্সিলর,এস প্লাস নিউজ,কলকাতা:

“মা আজ আমার খুব মন খারাপ”। দশ বছরের ঋষির কথা শুনে মা বেশ অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, “কি হয়েছে তোমার?”
অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো ঋষি, কোনো উত্তর না দিয়ে। মা চট জলদি ছেলের মন ঠিক করতে পিৎজা অর্ডার দিলেন, কারণ পিৎজা খেতে ঋষি বড্ড ভালোবাসে যে।
এরপরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো ঠিক তিন দিনের মাথায়, যখন প্রিন্সিপাল ম্যাডাম গার্জেন কল করলেন। কারণ ঋষি, রাজের মাথায় পেন্সিল বক্স দিয়ে মেরেছে। একটা শান্ত, নিরীহ ছেলেকে বিনা বিচারে সাত দিনের জন্য সাসপেন্ড করা হলো। আর মা বাবার কাছে আসল কারণটাই অজানা থেকে গেলো।

বাড়িতে আসা অঙ্ক টিচারের কাছে রাই কিছুতেই পড়তে চাইছে না। খালি ভয় পাচ্ছে ছোট্ট মেয়েটি। মা বাবা মনে করছেন, পড়তে চাইছে না তাই এরকম দুষ্টুমি করছে রাই। এর জন্য মায়ের কাছে বেশ মার খেতে হচ্ছে তাকে। কান্নাকাটি করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে সে, আর ঘুমের মধ্যে কোনো অজানা ভয়ে আঁতকে উঠছে। আর বলছে, *আমি পড়বো না, আমি পড়বো না, আমার খুব ব্যথা করছে মা*।

প্রত্যেক উইকেন্ডে অর্ণবের বাড়িতে পার্টি মাষ্ট। সেই দিন তাদের ক্লোজ ফ্রেন্ডের গ্রুপের একটা গেট টুগেদার হয়, আর তার সাথে চলে মদ আর প্রচুর খাওয়া দাওয়া। কিছু দিন ধরে অর্ণব লক্ষ্য করছে বান্টি কিছুতেই পার্টির সময় থাকতে চাইছে না, আর খুব কান্নাকাটি করছে, রীতিমতো বিরক্ত হয়ে অর্ণব আজ সবার সামনেই বান্টিকে গালে একটা চড় মারল। বাচ্চাটা এখন খুব ঘ্যান ঘ্যানে হয়ে যাচ্ছে, খাবার দাবার, বেড়ানো, গেম, টিভির কোনো অভাব নেই তাও যেন কিছুতেই এদের শান্তি নেই।

মিতুকে বাড়িতে একজন কম বয়সি মহিলা আয়ার কাছে রেখে যায় নীলা। শ্বশুর শাশুড়ির কাছে রাখতে বড্ড ঝামেলা, কারণ তাঁদের যত সব পুরনো মানসিকতা, আর নীলা কখনোই চায় না তাদের একমাত্র সন্তান গ্রাম্য মানসিকতার হোক। তবে আজকাল মিতুর ব্যবহারিক খুব পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, কিছুতেই যেন মিতুর মধ্যে শান্তি নেই, খুব রাগ জেদ আবার পাশের বাড়ির গোগোর সাথে খেলতে গেলে খুব বাজে বাজে কথা বলছে আর শরীরের ব্যাক্তিগত জায়গায় হাত দিয়ে খেলতে চাইছে। নীলার মনে হলো কোনো সাইকোলজিস্টকে দেখানো উচিৎ।

রাজা আর মিনু খুব বিরক্ত তাদের তিন বছরের জিজার ব্যবহারে, মাঝ রাতে উঠে খুব কান্নাকাটি করছে, আর কিছুতেই নিজের বিছানায় শুতে চাইছে না। ওর মনের ইচ্ছা মা বাবার মাঝখানে শুতে। প্রথম কদিন জিজার ইচ্ছা মেনে নিয়েছে তারা। কিন্তু রোজ রোজ মেয়ের এই জেদ মানা সম্ভব না। একজন ফ্যামিলি কাউন্সিলরকে জানানো উচিৎ মনে করছেন তারা।

উপরের প্রত্যেকটি ঘটনা সম্পূর্ণ বাস্তবতায় পরিপূর্ণ। ভালো করে যদি ঘটনাগুলিকে মন দিয়ে অ্যানালিসিস করা যায় তাহলে বোঝা যাচ্ছে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সন্তানদের নিয়ে সমস্যা মা বাবার। আর তারা মনে করছেন, একজন সাইকোলজিস্টকে দিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।

প্রথমে ঋষির কথায় আসা যাক, গল্পটি পড়ে বোঝা যাচ্ছে ঋষি একটু শান্ত প্রকৃতির ছেলে। কিন্তু কোনো ভাবে সে তার রাগ চাপতে না পেরে বন্ধুকে আঘাত করেছে। এক্ষেত্রে মাকে সে বলার চেষ্টা করেছিলো, কিন্তু মা বিষয়টি অন্যভাবে অর্থাৎ ছেলের মন ভোলাবার অন্য ব্যবস্থা করেছেন। ঋষি তার মাকে কথাটা বলতে পারেনি ঠিক, কিন্তু আমাকে জানিয়েছে। স্কুলে দীর্ঘ দিন রাতুলের কাছে মারধর, বাবা মাকে দেওয়া গালাগালি, আর নোংরা ভাষা সহ্য করতে না পেরে সে মারতে বাধ্য হয়। আর বাড়িতে অনেক বার মাকে বলতে চেষ্টা করেছে কিন্তু পারে নি।

দ্বিতীয় গল্প রাইকে নিয়ে, তার সমস্যা হলো সে অঙ্কের টিচারের কাছে পড়তে চায় না, কারণ অঙ্কের স্যার তাকে কোলে নিয়ে ব্যাড টাচ করে, জোরে জোরে গাল টেপে, খুব ব্যথা হয় রাইয়ের। কিন্তু মা বাবা ভাবে সে পড়তে চায় না তাই বাহানা করছে।

বান্টির গল্পটা বেশ অন্য রকম। প্রথমে ভেবেছিলাম কোনো কারণে বাবার বন্ধুদের দ্বারা উত্যক্ত হয়েছে সে কিন্তু আসল কারণ অন্য জায়গায়। বাবার বন্ধুদের সাথে তার মায়ের নাচ একদম পছন্দ না তার। তাই জেদ করে কান্নাকাটি করে যাতে মাকে কেউ টাচ করতে না পারে।

ছোট্ট মিতু অজান্তেই তার আয়ার মোবাইল এ নুড ছবি আর ভিডিও দেখেছে। আয়া দিদি আরো বলেছে কিভাবে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিলে ভালো লাগে, তাই সে তার কথা মত গোগোর বাড়ী গিয়ে খেলতে খেলতে গোগোর বোনের গায়ে হাত দিত। কারণ আয়া দিদি বলেছে মেয়েদের সাথে এমন করতে হয় ছেলেদের সাথে না।

শেষের গল্প ছোট্ট জিজাকে নিয়ে, কারণ সে চায় বাবা মা সব সময় তার কাছে থাকুক। বাবা মায়ের পাশে জড়িয়ে হামি খেতে দেখলে তার খুব কষ্ট হয় যে। কারণ সে চায় বাবা মা তাকে এমন করে জড়িয়ে হামি খাক, আদর করুক।

সমস্যাগুলো কোনোটাই গল্প না, ঘোরতর বাস্তব। কারণ এখানে প্রত্যেক শিশুর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। সব চেয়ে কাছের যারা অর্থাৎ বাবা মা তাদের কথা শুনতে চাইছে না। উল্টে তাদের মন রাখতে তাদের ভালো লাগার জিনিসগুলো অজান্তে জোর করে চাপিয়ে দিচ্ছেন। যখন ছোট ছোট মনগুলো চাইছে, একটু আদর, একটু ভালোবাসা আর তাদের মনের কথাগুলো শোনাতে তখনই বাবা মায়েরা ব্যস্ত তাদের নিজেদের নিয়ে। আর সব ক্ষেত্রেই সমস্যা মনে হয় তাদের বাচ্চাদের নিয়ে তাই সাইকোলজিস্ট হচ্ছেন আসল ওষুধ যিনি সমস্ত কিছু সমাধান করতে পারবেন।

একটু ভেবে দেখুন তো। ঋষি, রাই, মিতু, জিজা এদের দোষ কোথায়? এদের ছোট্ট মনগুলো কি চায় সেটা কি খুব অন্যায়?বাবা মায়ের আদর, মা এর উপর পসিসিভ ব্যবহার কোনোটাই খারাপ কি? আমরা কোথাও আমাদের ছোটবেলা ভুলে যাচ্ছি, যেখানে খোলা মাঠ আর বুক ভরে নিশ্বাস নেবার জায়গা ছিল কিন্তু আজ এই ছোট বাচ্চাদের জগৎ সম্পূর্ণ মুঠো ফোনে বন্দী তাই ভুল বশত কোনো ভুল জিনিস দেখে ফেললে ছোট কৌতূহলী মনে অনেক প্রশ্নের ভিড় হয়। এদের কাছে মন দিয়ে জানতে চাই কি হয়েছে, খাবার দিয়ে বা খেলনা দিয়ে না। বাবা মা সব থেকে মনের মানুষ আর তারাই সব থেকে বড় কাউন্সিলর।

দেখবেন বন্ধুরা যেন দেরী না হয়ে যায়। শিশু মন একটা ছোট্ট কুড়ির মত। তাকে সুন্দর করে ফুটতে দিন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: