টিনেজ বাচ্চাদের নিয়ে কি কি সমস্যা হতে পারে

0 1


সুমনা বাগচী,এস প্লাস নিউজ,কলকাতা: কিছু দিন ধরে অর্ঘ্য খুব আনমনা থাকে, কলেজে যেতে চায় না।সারাক্ষণ বাড়িতে দরজা বন্ধ করে বসে থাকে।এমিলি ক্লাস ১১ এ পরে।আজকাল খুব বাবা মায়ের মুখে মুখে কথা বলে। সবসময় খুব রাগ আর বিরক্তি তার মধ্যে।প্রজ্ঞানা ক্লাস ৭ এ পরে।বাড়িতে বাবা মায়ের রোজ ঝগড়া।সারাক্ষণ কাজের মাসীর কাছে থাকে সে।কারণ বাবা মা দুজনেই কর্মরত।অফিসের পর বাড়ি এসে তাদের মধ্যে নিত্য অশান্তি,মারপিট। তাই সে তার নতুন মোবাইল এ সারাক্ষণ গেম খেলে ভুলে থাকতে চায়।

: এই ঘটনাগুলি কোনোটাই সাজানো কিংবা শুধু মাত্র চরিত্র উপস্থাপন করে গল্প লেখা না।এ আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির সমস্যা।আমরা যদি একটু ভেবে দেখি তাহলে বুঝতে পারবো আমাদের ছোটোবেলাগুলো কোথাও হারিয়ে গেছে।হাতরে শুধু স্মৃতি ছাড়া কিছুই পাইনা।আজকাল বাচ্চাদের জগৎ অনেক বেশি কমার্শিয়াল।মা বাবা কে কাছে না পেলে মোবাইল,গেম,ইন্টারনেট তাদের একমাত্র সঙ্গী। নিউক্লিয়ার পরিবারে বাবা মা সন্তান ও কাজের লোক। কোথাও মনের আদান প্রদান সীমিত।ছেলেবেলাগুলো তাদের কাছে সম্পূর্ণ ম্যাটেরিয়ালিস্টিক।বাবা মায়ের কাছে একদিন এরাই প্রবলেম চাইল্ড।তাই এদের কাউন্সেলিং করতে নিয়ে আসে আমাদের কাছে।কিন্তু তাঁরা ভুলে যান কাউন্সেলিংটা কাদের সব থেকে বেশি দরকার।মা বাবাদের কমপ্লেইন ,ছেলে মেয়েরা কথা শোনেনা,খুব ভায়োলেন্ট ভাবে রিএক্ট করে,সারাক্ষণ মোবাইল ও কম্পিউটারে সময় কাটায় নয় তো বন্ধুদের সাথে লেট নাইট পার্টি আর আকন্ঠ মদ্য পান।অনেক সময় বাবা মা হাতে নাতে তাদের ধরে ফেলেন পর্ণ ভিডিও দেখার সময়।সিগারেট,গাঁজা নানা রকম মাদক সেবনে তারা উশৃঙ্খল জীবন কাটায়।এই সব কিছুই তাদের কাছে সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার তাই কাউন্সেলিং একমাত্র উপায়।

: সমস্যাগুলি কোনোটাই অগ্রাহ্য করার বিষয় না সত্যি বাবা মা হিসাবে আমাদের সন্তানদের জন্য সময় খুব কম।তাই তাদেরকে শাসন করাই একমাত্র উপায় আমাদের কাছে।কখনো কখনো গায়ে হাত তুলে নিজের রাগ প্রকাশ আবার দরজা বন্ধ করে দিয়ে সমস্যার সমাধান করা।কিন্তু তাদের মনের কাছে পৌঁছাবার কোনো চেষ্ঠাই আমরা করিনা।কোনো দিন তাদের পাশে শুয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করি,আমাদের সন্তানেরা কেমন আছে?কোথাও জানতে চাই তাদের কোনো সমস্যা আছে কিনা?নাকি শুধু ছেলে ভোলানোর মতো দামী উপহার তাদের জন্য একমাত্র ভালোবাসা?

️: উত্তর গুলো আমরা নিজেরাই জানিনা।আমাদের প্রত্যেকের জানা উচিৎ প্রত্যেকটি বাচ্চা স্বতন্ত্র।তাদের ভাবনা,বেড়ে ওঠা,ক্রিয়েটিভিটি সব কিছুই তাদের মতো।সেখানে অন্য কারুর সাথে তুলনা করা ঠিক না।সমস্যা সেখানেই হয় যখন একটা বাচ্চার সাথে অন্য একটি বাচ্চারা মধ্যে গুণগত মান নিয়ে তুলনা করা হয়।কোথাও সেই বাচ্চার মধ্যে লজ্জা, কষ্ট আমাদের চোখের আড়াল হয়।

: কিছু গবেষণা ও কেস স্টাডিতে দেখা গেছে,অনেক প্যারেন্টস ও স্কুল এর টিচাররা কমপ্লেইন করছে বাচ্চার মধ্যে সেক্সুয়াল অ্যাকটিভিটি নিয়ে।তাদের বক্তব্য অনুযায়ী টিনেজ বাচ্চাটির ব্যবহারিক পরিবর্তন।অন্য সহপাঠীকে জড়িয়ে ধরা,চুমু খাওয়া কিংবা নিজেদের গোপনাঙ্গে হাত দিয়ে থাকা।এসবই তাদের কাছে সমস্যার সিম্পটম।বাবা মায়ের কাছে অত্যন্ত লজ্জার বিষয়,অল্প বয়সে পেকে যাওয়া ইত্যাদি।বাচ্চাটির সাথে কথা বলার পর জানা গেলো,সে মাঝে মাঝে রাতেই তার বাবা মাকে সঙ্গমে লিপ্ত হতে দেখে।কোথাও তার মধ্যেও সেই ইচ্ছার বহির্প্রকাশ ঘটে।তাই সে তার ওই ধরনের আচার ব্যবহারে নিজেকে তৃপ্ত করতে পারে।মাঝে মাঝে মোবাইল পর্ণ সাইট দেখে নিজের অভিলাষা পূর্ণ করার জন্য।এক্ষেত্রে আমরা যদি একটু ভেবে দেখার চেষ্ঠা করি তাহলে বুঝতে পারবো,এখানে কার ব্যবহারিক পরিবর্তনের প্রয়োজন।শারীরিক চাহিদা আমাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।কিন্তু একটা টিনেজ বাচ্চাটি যখন বড়ো হয় তখন কিছু বিষয় আমাদের সজাগ থাকা প্রয়োজন।মনে রাখা উচিৎ বাচ্চাটির শারীরিক বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো যৌন চেতনা ও অনুভূতির প্রকাশ।তাই সচেতনতা বাবা মা কে অবলম্বন করা উচিৎ।আমরা কোথাও বাবা মা থেকে বন্ধু হতে পারিনা।খোলা মেলা আলোচনা, শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা,গুড টাচ, ব্যাড টাচ বিষয় টি গুছিয়ে বলা,পিয়ার প্রেসার নিয়ে কথা বলা সব কিছুই কিন্তু সমস্যার সমাধান করে দেয়।এক্ষেত্রে কোনো কাউন্সেলর এর দরকার হয় না।️

: স্কুলে টিচার দের মধ্যেও বিশেষ কিছু গুন থাকে যা বাচ্চাদের মধ্যে হীনমন্য মনোভাবকে বাড়িয়ে দেয়।অযথা বিষয়টি সরল ভাবে না দেখে তাকে নিয়ে ঠাট্টা, ইয়ার্কি কিংবা সবার সামনে অপমান করা তে বাচ্চাদের মধ্যে প্রতিশোধ পরায়ণতা বাড়ায়।

️: টিচারদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম এর ক্ষেত্রে মন ও মনন নিয়ে আলোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।সেক্ষেত্রে আমাদের মধ্যেও কোথাও ঘাটতি আছে।আরেকটি কেস যা বর্তমানে সমস্ত বাবা মায়ের কাছে মূল সমস্যার বিষয় তা হলো বাচ্চাদের মিথ্যা কথা বলা।আমাদের প্রত্যেকের জানা উচিৎ আমরা মিথ্যা কেনো বলি?এক: আমরা নিজেদের কে আরো বেশি সুন্দর ভাবে সকলের সামনে উপস্থাপিত করার জন্য মিথ্যা বলি।যা শুধু বাচ্চারা না বড় রাও করে।দুই:অন্যায় থেকে বাঁচতে মিথ্যা বলি অর্থাৎ কোনো ভুল করে থাকলে সেটার জন্য মিথ্যা বলি যা ডিফেন্স মেকানিজম বলা যায়।তিন:স্কুলে টিচারদের কাছে ভালো থাকার জন্য মিথ্যা বলি।চার:আমরা কঠিন বাস্তবের সম্মুখীন হতে না চাইলে মিথ্যার আশ্রয় নি।এক্ষেত্রে বলা বাহুল্য আমাদের বুঝতে হবে আমাদের বাচ্চা কেনো মিথ্যা বলছে? সমীক্ষায় দেখা গেছে বাবা মা কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে একটি শিশু প্রথম কথা বলতে ও ভাব প্রকাশ করতে শেখে।সেক্ষেত্রে পরিবারের কোনো সদস্য যদি মিথ্যা বলে,শিশুর মধ্যে তা প্রতিফলিত হয়।তাই একটি বাচ্চাকে দোষ না দিয়ে সমস্যার মুলে গিয়ে জানা উচিত।তার মধ্যে ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ও সেল্ফ মোটিভেশন বাড়ালে খুব সহজেই এই সমস্যার মুক্তি পাওয়া যায়।

বর্তমানে আরেক টি বিশেষ সমস্যা হলো ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির প্রকোপ।প্রায় প্রত্যেক দিন আমরা খবরে বিষয় টি দেখে থাকি।বেশ কিছু দিন আগে এই বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।আমরা যদি একটু মন দিয়ে ভাবতে চাই তাহলে দেখতে পাবো sex education বিষয়টি আজও ঠিক মতো চালু না।একটু শিশুকে শুধু তার প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে বড়ো করা একমাত্র কাজ না।তার মানসিক বিকাশের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে।বাড়ির প্রত্যেকের প্রতি সম্মান,ভালোবাসা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় তার পরবর্তী জীবনকে প্রভাবিত করে।দেখা গেছে যে পরিবারে বাবা মায়ের মধ্যে সংঘর্ষ,শারীরিক নির্যাতনের নমুনা দেখা যায় সেই পরিবারে শিশুদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে।কারণ সে ছোট বেলা থেকে মা কে অত্যাচারিত হতে দেখেছে।তার মধ্যেও সেই পুরুষ সত্তার প্রকাশ পায় যেখানে অন্যকে শারীরিক ভাবে অত্যাচার করে তৃপ্ত হওয়া যায়।আমার নিজের এক অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ব্রথেল এ কাউন্সেলিং করার সময় একটি ঘটনা যা আমার মনকে নাড়া দিয়েছিল তা হলো একটি ছেলে তার মা কে খুন করে সেই মৃতা মায়ের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করেছিল।বিষয়টি আমাদের কাছে জটিল ও মনস্তত্ত্বের সব রকম ধ্যান ধারণার বাইরে।কিন্তু শিশু কালে দীর্ঘ দিন মা কে অন্য পুরুষের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত দেখে তার মধ্যে এক অন্য রকম মানসিক অবস্থার প্রকাশ পায়।আমাদের প্রত্যেকের বোঝা উচিত বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সন্তানদের সাথে খোলা মেলা আলোচনার ভিত্তিতে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।কোথাও আমাদের ব্যস্ততা ও বাচ্চাদের সঙ্গ না দেবার জন্য তাদের চিন্তা ভাবনা ও মানসিক স্বাস্থ্যের পরিবর্তন ঘটছে।আমরা বিষয় গুলি গভীর ভাবে ভাবিনা।শুধু শাসন কিংবা শাস্তি তে বিশ্বাসী।যার ফল স্বরূপ তাদের মধ্যে আরো বিকৃত মানসিকতার প্রকাশ ঘটায়।প্রত্যেক সম্পর্ক সম্মান করা,প্রতিহিংসা পরায়ন মনোভাব থেকে বিরত থাকা প্রভূত বিষয় তাদের সাথে খোলা মেলা আলোচনা করা শ্রেয়।তাদের বোঝানো উচিৎ বল পূর্বক কখনোই কারুর প্রতি ভালোবাসা আদায় করা যায় না।প্রত্যেক মুহুর্তের জন্য আমাদের জীবনে সময় আসে।যার জন্য অপেক্ষা করা বাঞ্ছনীয়।ধর্ষণ শ্লীলতাহানিতে অন্যের অসম্মান এর সাথে সাথে নিজের অসম্মান বেশি।কারণ এর পরিণতি সমাজে আইন সিদ্ধ।


আমরা সবাই চেষ্ঠা করলে বাড়ির সুন্দর পরিবেশের মধ্যেই বাচ্চাকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারি।যার জন্য আমরা নিজেরাই সব থেকে ভালো কাউন্সেলিং করতে পারবো।যার জন্য বাইরে যাবার প্রয়োজন নেই।বাবা মা মানেই শাসনের তকমা না নিয়ে বন্ধু হিসাবে এগোনো অনেক বেশি যুক্তি যুক্ত।চেষ্ঠা আমাদেরই করতে হবে।কারণ আমাদের সন্তান আমাদের সমাজের ভবিষ্যৎ।আসুন আমরা এগিয়ে চলি।চেষ্ঠা করি এই সব সমস্যার সমাধানের।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: