চলুন ঘুরে দেখি সবুজে ঘেরা বর্ধমানের সিঙ্গি


অসীম তালুকদার,এসপ্লাস নিউজঃ অনেকদিন কোথাও বেড়োনো হয়নি, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তা হলে চলে যান সিংগি।। হাওড়া থেকে কাটোয়া লোকাল ধরে পাটুলি ষ্টেশনে নামতে হবে এবং সেখান থেকে শেয়ার গাড়ি অথবা টোটো করে শান্তিনিকেতন হোমস্টে।

সিঙ্গি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় অবস্থিত একটি ছোট্ট গ্রাম। এখানে প্রকৃতি নিজেকে একটি দুর্দান্ত উপায়ে উপস্থাপন করেছে। এই জায়গাটি পুরোপুরি সবুজ রঙে ঘেরা। তবে সিঙ্গি কলকাতা থেকে এতটা দূরে নয়। আপনি যদি আপনার প্রতিদিনের নগর জীবন থেকে একটি সংক্ষিপ্ত বিরতি পেতে চান তবে সিঙ্গি আপনার জন্য উপযুক্ত পছন্দ। সিঙ্গি কলকাতা থেকে ১৩৫ কিলোমিটার দূরে। সেই ছোট্ট গ্রামের তাজা বাতাস আপনার মন ও আত্মাকে সজীব করবে। আপনি বাস্তব গ্রামের জীবনের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করতে পারেন। পাখি প্রেমীদের এবং ফটোগ্রাফারদের জন্য সিঙ্গি গ্রাম আদর্শ। এই গ্রামটি কেবল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ নয়; এটির একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমি রয়েছে। এটি বিখ্যাত কবি কাশীরাম দাসের জন্মস্থান, যিনি মহাকাব্য মহাভারতের বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। বিখ্যাত কবি কাশীরাম দাসের জন্মস্থান ছাড়াও পূর্বস্থলীর চুপির চর, ৩০০ বছরের পুরানো টেরাকোটার মন্দির, শ্রীবাতি গ্রাম, জোগাধ্য মন্দির ইত্যাদি সিঙ্গি গ্রামের আকর্ষণ।

জগদানন্দপুর রাধাগোবিন্দ মন্দির:

ছবিঃ এসপ্লাস নিউজ নেটওয়ার্ক

১৮৬৯ সালে ৮২ ফুট উঁচু রাধাগোবিন্দ জিউয়ের দ্বিতল মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন জগদানন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা রাধামোহন ঘোষ চৌধুরী। মন্দিরটি বেলে পাথরের তৈরি। ১৯৬৭ সালে রাজ্য সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগ মন্দিরটি অধিগ্রহণ করেছিল। জনশ্রুতি, মথুরা-বৃন্দাবন ও মির্জাপুর থেকে ভাগীরথী পথে দাঁইহাট পর্যন্ত বেলে পাথর নিয়ে আসা হয়।

নতুন গ্রাম:

ছবিঃ এসপ্লাস নিউজ নেটওয়ার্ক

কাঠের পুতুলের জন্য বিখ্যাত বর্ধমান জেলার নতুনগ্রাম।চেয়ারের হাতলে কাঠের প্যাঁচা, চেয়ার বা খাটের পায়ায় রাজা-রানির কাঠমূর্তি। দরজার পাল্লাজোড়া দুর্গার মোটিফ। বুকসেল্ফের গায়ে গণেশ জননী। কাঠের পুতুলের ব্যবহারটাই যেন বদলে গিয়েছে। পরিচিত কাঠের প্যাঁচা হোক বা রাজা-রানি এখন এগুলি ব্যবহার করা হচ্ছে দরজার ফ্রেম, ডাইনিং টেবল, সোফাসেট, সেন্টার টেবল, আয়না এমনকী খাটেও।

কবি কাশীরাম দাস:

ছবিঃ এসপ্লাস নিউজ নেটওয়ার্ক

বর্ধমান জেলার অন্তর্গত সিঙ্গিগ্রামে (কোন কোন মতে সিদ্ধ বা সিদ্ধিগ্রাম) কাশীরামের জন্ম হয়েছিল। কাশীরাম বেদব্যাস বিরচিত সংস্কৃত মহাকাব্য মহাভারত অবলম্বনে লেখেন ভারত-পাঁচালী। কাশীরাম দাস সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন। গবেষকদের অনুমান, ভারত-পাঁচালী রচনা সমাপ্ত হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে কিংবা সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে।

শ্রীবাটির মন্দির:

ছবিঃ এসপ্লাস নিউজ নেটওয়ার্ক

প্রায় ৪০০ বছর আগে সুদূর গুজরাট থেকে চন্দ্র পদবীর একটি বণিক পরিবার কাটোয়ায় এসে উপস্থিত হন। হুগলি নদী তখন নাব্য ছিল এবং চন্দ্র পরিবার এই নদীপথে বাণিজ্য করে অত্যন্ত ধনী এবং প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। শ্রীবাটিতে তাঁরা একটি বিশাল প্রাসাদ ও বেশ কয়েকটি মন্দির নির্মাণ করেন।
তিনটি মন্দিরের মধ্যে (দর্শকদের) বাঁদিক থেকে পর পর একটি চতুষ্কোন বেসের দেউল মন্দির, (মাঝে) পঞ্চরত্ন মন্দির এবং একটি আটকোণা বেসের দেউল মন্দির। প্রতিটি মন্দিরই টেরাকোটার কাজে আদ্যন্ত অলঙ্কৃত। তিনটি মন্দিরই শিবমন্দির, শিবলিঙ্গ বর্তমান। মাঝের পঞ্চরত্ন মন্দিরে আছেন সাদা রঙের ভোলানাথ, আটকোণা দেউলে কালো রঙের চন্দনেশ্বর এবং চারকোনা দেউলে বিশ্বেশ্বর।
মন্দিরগুলির টেরাকোটার কাজ এত সুন্দর এবং সৌভাগ্যক্রমে এত ভালো আছে যে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয়।

চুপির চর:

ছবিঃ এসপ্লাস নিউজ নেটওয়ার্ক

চুপির চর। নামের সঙ্গে একটা যেন লুকোচুরির সম্পর্ক আছে। প্রতিবছর শীতকালে হাজার হাজার পাখি দূর-দূরান্ত থেকে আসে এই নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে। একসময় চুপি সম্পূর্ণ ভাবে ছিল চোরা পাখিশিকারীদের হাতে। আর তখন বন্দুকবাজরা শিকার করত নিরীহ পাখিদের মনের আনন্দে। এখন ক্যামেরা ও বাইনাকুলার নিয়ে যাই আমরা পাখি দেখতে। স্থানীয় অধিবাসী ও প্রশাসনের নজরদারিতে পরিযায়ী পাখিদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। যদিও পরিবেশ ও পাখিদের জন্য জোরে মাইকের বাজানো নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তবুও চলে বনভোজনের উৎসব।
শীত পড়তেই এখানে সুদূর হিমালয়, ইউরোপ, মঙ্গোলিয়া থেকে পরিযায়ী পাখি হাজির হয়। এই সময় পাখি প্রেমিক ছাড়াও অনেক মানুষ আসে চুপির চরে বেড়াতে।
নৌকায় পর্যটকদের নিয়ে ঘুরে বেড়ান, ঘণ্টা পিছু ১৫০ টাকা ভাড়া নেন মাঝিরা। এরাই হদিশ জানেন পাখিদের । কোন পাখি কখন কোথায় বসে, কোথায় থাকে।




%d bloggers like this: